সর্বশেষ সংবাদ

সোনার বাংলায় প্রাণ আগে না বিদ্যুৎ আগে?

 

আমি নরসিংদীর ছেলে প্রবাসে (সিঙ্গাপুর) থাকি। স্বদেশ চিন্তায় সর্বদা ব্যাস্ত থাকি। তাই প্রবাসে থেকেও আমার প্রিয় বাংলাদেশকে নিয়ে লেখালেখি করি। চট্টগ্রামের বাঁশখালীর লোকগুলো গ্রামের চাষা-ভুষার দল। কেউ ক্ষেতে-খামারে কাজ করে, কেউ ঘর-গৃহস্থালি করে, কেউ বা দিনমজুর, দিন আনে দিন খায়। বাপ-দাদার ভিটে মাটিতে মাথা গুঁজে রোদ-বৃষ্টি, ঝড়-ঝাপটা সয়ে একরকম দিনগুজার করে আসছিল তারা এতকাল। তাদের সে স্বাভাবিক জীবনাচারে বাধা হয়ে দাঁড়াল উন্নয়নের বিদ্যুৎ। শুধু বাধা হয়েই দাঁড়াল না, উন্নয়নের গুলি ঝাঁঝরা করে দিল কয়েকটি তরতাজা প্রাণ।

বাঁশখালী

কিছুক্ষণ আগেও হেঁটে চলে বেড়ানো, আমার মাটি আমার ঘর, বিদ্যুৎ কেন্দ্র দূর করো, বাপের ভিটা ছাড়ব না, বিদ্যুৎ কেন্দ্র হবে না বলে স্লোগান দিতে থাকা আঙ্গুর আলী, জাকের আহমেদ, বাদশা মিয়া, মুর্তুজা আলী, গোলাম আহম্মদদের বুক এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিল বন্দুকের গুলি। চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে গণ্ডামারা এলাকায় এস আলম গ্রুপের কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ বাতিলের দাবিতে আন্দোলনরত জনতার ওপর পুলিশের গুলিতে তারা প্রাণ হারাল। হতাহত হলো অর্ধশতাধিক নারী-পুরুষ। এদের মধ্যে অন্তঃসত্ত্বা এক নারীর অবস্থা খুব গুরুতর। সেও মারা গেছে বলে শোনা গেছে।

কিন্তু এমনটা কি হওয়ার কথা ছিল? পুলিশের গুলিতে সাধারণ জনগণ প্রাণ হারানোর কথা ছিল? যেকোনো উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড তো জনগণের স্বার্থেই। তা ছাড়া দেশে বিদ্যুৎ ঘাটতিও প্রচুর। চলতি ঘাটতি মেটানোর জন্য এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক যে বিদ্যুৎ কেন্দ্র এস আলম গ্রুপ চায়না সেফকো কোম্পানির সঙ্গে মিলে করছে, তাতে জনগণের তো খুশি হওয়ার কথা। তারা বিরোধিতা করল কেন ? বিষয়টি বুঝতে হলে যেতে হবে ঘটনার আরেকটু গভীরে।

জনবসতি তুলে দিয়ে এই যে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, তার আগে স্থানীয় জনপরিবেশের ওপর কী প্রভাব পড়বে, তার হিসাব কি করা হয়েছে ঠিক-ঠাক ? শোনা যাচ্ছে, প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য যে কমিটি পাঠানো হয়েছিল বাঁশখালীতে, তারা সব দেখেশুনে রিপোর্ট করেছে, এই প্রকল্পের আওতায় দেড়শ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কার্যত উচ্ছেদ হবে সাত হাজার পরিবার, জেলেরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, লবণ চাষিরা উচ্ছেদ হবে।

এখানে প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে শুরুতেই। দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে যে বিদ্যুৎ, দেশের অতিসাধারণ নাগরিকদের সঙ্গে প্রতারণা করে কেন তার শুরু হবে ? এখন এই পরিস্থিতিতে ভিটে ছাড়া হওয়ার ভয়ে তটস্থ জনতা ক্ষেপে গেলে তাদের খুব বেশি দোষ দেওয়া যায় না আমি মনে করি।

সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ঠিকঠাক পরিবেশ সমীক্ষা করা হয়নি বলে শোনা যাচ্ছে। জীবন-জীবিকা, পরিবেশ-প্রতিবেশের ওপর এর কী প্রভাব পড়বে, তার কিছুই বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। জনগণকে ধোঁয়াশায় রাখা হয়েছে। সাধারণ মানুষের কাছে তথ্য গোপন করে কিছু জমি কেনা হয়েছে, প্রকৃত দাম দেওয়া হয়নি, অন্যদের জমি জোর করে দখল করার পাঁয়তারাও চলেছে। এসব কার স্বার্থে ?

শেষ মুহূর্তে জনগণ নিজেদের আশু বিপদের আঁচ পেয়ে নিজেরাই প্রতিরোধে নেমেছে। পাড়া-মহল্লায় নিজেরা দল বেঁধে মাঠে নেমেছে, বাপ-দাদার ভিটে ছাড়া করার এ প্রকল্প হতে দেবে না তারা রুখে দাড়িয়েছে অত্যাচারের বিরুদ্ধে।

বরাবরের মতো স্থানীয় জনতা দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে এই প্রকল্পকে ঘিরে। একদল বেনিফিশিয়ারি নেমেছে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের পক্ষে। এই পক্ষ যে ক্ষমতাসীনদের মদদ পুষ্ট, সে কথা বলা বাহুল্য। অন্য পক্ষে আছে সাধারণ জনতা। যারা বসতভিটা হারানোর ভয়ে অস্থির। তারা কোমর বেঁধে নেমেছে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র ঠেকাতে। সমাবেশ ডেকেছে। পুলিশ ১৪৪ ধারা জারি করেছে। শেষ সম্বল যখন লুটের পাঁয়তারা চলে, ১৪৪ ধারা তখন তুচ্ছ মনে হয়। তারা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে সমাবেশ করতে মাঠে নেমেছে। সংঘর্ষ বেধেছে বিরোধী পক্ষের সঙ্গে। যে পুলিশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা, তারা এক পক্ষের পক্ষে নেমে জনগণের ট্যাক্সের টাকায় কেনা বন্দুক তাক করেছে জনগণের ওপর। দ্রুম-দ্রাম গুলি ছুড়ে মানুষ মেরেছে। পুলিশকে এমন নির্বিচারে গুলি চালানোর হুকুম কে দিল? কেনই বা দিল? মানুষের প্রাণ আগে না বিদ্যুৎ?

স্বাধীনতার আগে ভিনদেশি পুলিশ এ দেশীয় ছাত্র-জনতার ওপর অস্ত্র বাগিয়ে ধরত যেমন, প্রচণ্ড হতাশাজনক হলেও সত্য, এ ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনটাই দেখা গেল! দেশের পুলিশ, দেশের মানুষ গুলি করে মারবে কেন? পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের অজুহাত হয়তো তাঁরা দেবেন, কিন্তু সেই অজুহাতে সাধারণ জনতাকে গুলি করে মেরে ফেলতে হবে? আর কোনো উপায়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না? যেত না? গুলি করা ছাড়া যে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে না, তাদের পুলিশি দায়িত্ব-কর্তব্যই বরং প্রশ্নসাপেক্ষ। যে উন্নয়নের হোতারা জনগণকে বুঝিয়ে উন্নয়ন কার্য চালাতে পারে না, জোর করে উন্নয়নের বোঝা চাপিয়ে দেয়, বিনিময়ে প্রাণ কেড়ে নেয়, প্রশ্নসাপেক্ষ হয় তাদের অবস্থানও।

একে তো প্রকাশ্যে পুলিশ নির্বিচারে গুলি করে পাঁচ/ছয়জন মানুষ মেরেছে, উল্টো মামলাও দিয়েছে তাদের নামেই। বাঁশখালী আন্দোলনের পরের দিনই পুলিশ অজ্ঞাত তিন হাজার ২০০ জনকে আসামি করে মামলা করেছে। মারল পুলিশ, মামলাও দায়ের করল পুলিশ। মরল জনতা, আসামিও জনতা। এখানে আইনশৃঙ্খলা চরমভাবে শৃঙ্খলিত যেন! এই প্রহসন মেনে নেওয়া যায় না। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য মেনে নিতে হচ্ছে। তাঁরা যা করছেন, কেবল চেয়ে চেয়ে দেখে যাওয়া ছাড়া আর কিছুই যেন করার নেই কারো। মানুষ যেন একদম চাবি দেওয়া পুতুল।

ঘটনার দিন থেকেই আমার মাথার ভিতরে বনবন করে ঘুরছে কিছু প্রশ্ন। প্রাণ আগে না বিদ্যুৎ? ‍উন্নয়ন আগে নাকি নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা? বেঁচে থাকা আগে নাকি ভালো থাকা? বেঁচেই যদি না থাকা হলো, তো ভালো থাকার প্রশ্ন আসবে কোত্থেকে? জনগণকে এইভাবে যদি পাখির মতো গুলি করে মেরে ফেলা হয়, তবে সে উন্নয়ন ভোগ করবে কে? ছয়-সাত হাজার জনগণকে বাস্তুভিটা উচ্ছেদ করে, পরিবেশ/প্রতিবেশ ধ্বংস করে, লোকালয়ে প্রাইভেট কোম্পানির লাভের কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করে ফায়দা কী? ফায়দা কার? জনগণের যে নয়, তা জনগণ এর বিরুদ্ধে প্রাণ বিলিয়ে দিয়ে নিজেরাই প্রমাণ দিয়েছে। আবার যাদের কিছু ফায়দা এই প্রকল্প নিশ্চিত করবে, এই ঘটনাবলির ভেতর দিয়ে তাদের মুখোশও উন্মোচিত হয়েছে।

এখন কথা হলো, এই যে পাঁচ/ছয়জন মানুষ পুলিশ গুলি করে মেরে ফেলল এর দায়ভার নেবে কে? যারা মারা গেল, তাদের স্ত্রী-পুত্র আত্মীয়-পরিজন কোথায় যাবে? কার কাছে যাবে? আমরা যে প্রেম-ভালোবাসা, মায়া-মমতা, স্নেহ নিয়ে বাস করি সমাজে, তারাও একই বন্ধনে আবদ্ধ ছিল। সেই সব সম্পর্কের মূল্য দেবে কে? দায়িত্ব নেবে কে? ক্ষতিপূরণ দেবে কে? কীভাবেই বা দেবে?

পুলিশ যে দায়িত্ব নেবে না, তা তাদের মামলার ধরন দেখেই তো বোঝা গেল। তিন হাজারের অধিক লোককে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। যারা মরেছে, তারা তো মরেছেই, গ্রামশুদ্ধ লোক এখন পুলিশি হয়রানির ভয়ে ঘরছাড়া। এই ঘর ছাড়া লোকগুলো যাবে কোথায় ?



Related posts

মন্তব্য করুন