আইনের হাত যে কত লম্বা তা দেখলো – অতিরিক্ত ডিআইজি হাবিবুর রহমান

 BRAND BAZAAR এ LED / 3D/ Smart / 4K TV 65% ডিস্কাউন্ট

আইনের হাত যে কত লম্বা তা দেখলো ঢাকা। আর সেই লম্বা হাতের কাছেই হেরে গেলো বাংলাদেশ-সৌদি আরবের দূরত্ব।

সেখানে পাচারের শিকার এক নারীকে উদ্ধার করে আনলো ঢাকা জেলা পুলিশ। উদ্ধার কাজে নেতৃত্ব দেন পুলিশ সুপার থেকে সদ্য পদোন্নতি পাওয়া অতিরিক্ত ডিআইজি হাবিবুর রহমান।

আন্তরিকতা থাকলে কেবল নিজ জেলা নয়, দেশের গন্ডি পেরিয়েও প্রবাসে থাকা নির্যাতিত কাউকে মুক্ত করা যায় তারই প্রমাণ দিলেন এই পুলিশ কর্মকর্তা। তার আন্তরিক প্রচেষ্টায় মরুভূমিতে নির্মম আর অমানবিক নির্যাতনের জগৎ থেকে উদ্ধার করে আনা হলো সাভারের বেদে পল্লীর বাসিন্দা সোমা আক্তার (২০) নামের এক তরুণীকে।

দেশে ফিরে স্বস্তির নিঃস্বাস ফেলে সোমার একটাই কথা,আমার জীবন ফিরিয়ে দিয়েছেন হাবিবুর রহমান স্যার। উনি না থাকলে অবশিষ্ট জীবন আমাকে মরুভূমির ধুসর মাটিতেই চোখের জল ফেলতে হতো। নচেৎ আত্মহত্যা করতে হতো।

জীবনমান বদলে দেওয়ায় এমনিতেই সাভারের বেদে পল্লীতে পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমানের কদর সীমাহীন। রয়েছে নানা পরিচয়। আস্থা, বিশ্বাস আর ভালোবাসায় অনগ্রসর এই জনগোষ্ঠীর কাছে তিনি এক কিংবদন্তি। কারো কাছে ভাগ্য বদলের প্রেরণা,কারো কাছে স্বাক্ষাত দেবতা। কারো কাছে অভিভাবক। আবার কারো কাছে একটি আদর্শ।সেই বেদেপল্লীর ওমরপুর গ্রামের দিনমজুর শহর আলী নিজের মেয়েকে উদ্ধারের আকুতি জান‍ান পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমানের কাছে। স্থানীয় একটি তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিক ছিলেন শহর আলীর মেয়ে সোমা আক্তার।

সংসারে নিত্য অভাব। সৌদি আরবে পোশাক কারখানায় চাকরি। ভালো বেতন, আকর্ষনীয় সুযোগ সুবিধা। সঙ্গে অভাব ঘুচিয়ে ভাগ্যবদলের প্রলোভন দেখিয়ে সোমা আক্তারকে গত ৭ ফেব্রুয়ারি পাঠানো হয়েছিলো সৌদি আরব।

পরিবারে স্বচ্ছলতা ফেরার আশায় সোমা আক্তারের বাবা ধার দেনা করে আজিজ ট্রেডিং করপোরেশন নামে রাজধানীর জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের মালিক বিল্লাল হোসেনের হাতে চাহিদা মতো নগদ ৭৫ হাজার টাকাসহ পরম ভরসায় তুলে দিয়েছিলেন নিজের মেয়েকে।

সৌদি আরবে যাবার পর পরই দালালের হাত বদল হয় সোমার। পোশাক কারখানায় চাকরি তো দূরের কথা। অমানবিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হন তিনি।

পরিস্থিতির কথা বাবাকে জানিয়ে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার কথা ফোনে জানান সোমা। এও জানান, সাত দিনের মধ্যে তাকে সেখান থেকে উদ্ধার করা না হলে আত্মহত্যা করবেন তিনি।

মেয়ের এই ব্যাকুল আর্তনাদে দিশেহারা বাবা ছুটে যান জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানে। আজিজ ট্রেডিং করপোরেশনের মালিক বিল্লাল হোসেনের হাতে-পায়ে ধরে আকুতি জানান,মেয়েকে ফিরিয়ে দিতে। প্রথমে কোনো পাত্তাই পাননি। পরে মেয়েকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্যে বিল্লাল তার কাছে দাবি করেন আড়াই লাখ টাকা।

মেয়েকে ফিরে পেতে আরো আড়াই লাখ টাকা। অন্যদিকে দেশে ফিরতে মেয়ের আর্তনাদ। হাতে বিষ খাবারও টাকা নেই এই পরিস্থিতিতে পাগল প্রায় দিনমজুর শহর আলী।

এভাবেই কেটে যায় প্রায় আড়াইটি মাস। এ সময় তার কষ্ট লাঘবে এগিয়ে আসেন স্থানীয় পোড়াবাড়ি সমাজকল্যাণ সংঘের সাধারণ সম্পাদক রমজান আহামেদ।
তিনিই শহর আলীকে নিয়ে যান ঢাকার পুলিশ সুপার (এসপি) অতিরিক্ত ডিআইজি হাবিবুর রহমানের কাছে।

হাবিবুর রহমান সবশুনে শহর আলীকে আশ্বস্ত করে বলেন, একটি পয়সাও কাউকে দিতে হবে না। দ্রুত নির্যাতিতা সোমাকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্যে যা যা করার সবকিছুই করা হবে বলে জানান তিনি।

শুরু হয়, হাবিবুর রহমানের তৎপরতা। দূতাবাসের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যোগাযোগ রক্ষা করে সেখানে সোমার সুরক্ষার যাবতীয় ব্যবস্থা নেন তিনি।

তেঁজগাও থানায় মানবপাচার আইনে দায়ের করা হয় মামলা। এভাবে হাবিবুর রহমানের একান্ত ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় গত মঙ্গলবার রাতে দেশে ফেরেন সোমা।

পোশাক কারখানার পরিবর্তে সৌদি আরবের হায়াল নাসিম এলাকায় নেয়া হয় তাকে। খালেদ আল আমুদি নামের এক ব্যক্তির বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ দেওয়া হয়। সেখানে একটি ফ্ল্যাটে অনেকটা বন্দি অবস্থায় কাজ করতে বাধ্য করা হয়। দুই ঘণ্টার বেশি ঘুমাতে দেওয়া হতো না। কাজে যোগদানের তিনদিন পরই তার ওপর নেমে আসে শারীরিক নির্যাতন।

দিন দিন তার মাত্রা বাড়তে থাকে। ভেবেছিলাম, এতগুলো টাকা খরচ করে এদেশে এসেছি। কষ্ট সহ্য করি। কিন্তু না। সেটা এক পর্যায়ে আর সহ্য করার মতো ছিলো না। এক পর্যায়ে ওই বাড়িত মালির পদে কাজ করা এক বাংলাদেশির মোবাইলফোন থেকে পরিবারের সদস্যদের কাছে তার ওপর নির্যাতনের কথা জানান। তবে ফিরে যেতে আড়াই লাখ টাকা লাগবে- এটা শুনে আরো ভেঙ্গে পড়েন।

‘ওরা আমাকে খেতে দিতো না। প্রায়ই মারধর করতো। দিনে খাবার হিসেবে দিতো একটি রুটি। আর গৃহকর্ত্রী মারধর করতেন কথায় কথায়। একদিন কাপড় ইস্ত্রি করার সময় জামা পুড়ে গেলো। সঙ্গে সঙ্গে গরম ইস্ত্রি আমার হাতে চেপে ধরেন গৃহকর্ত্রী। বাসা থেকে বের হতে দিতেন না। দেশে যোগাযোগ করার সুযোগ ছিলো না। আমার বাবা এসপি হাবিব স্যারের দেখা না পেলে হয়তো আমি কোনদিনই দেশে ফিরতে পারতাম না। কষ্টে,যন্ত্রনায় আমাকে আত্মহত্যা করতে হতো।’ তিন মাসের ‘বন্দিদশা’ থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফিরে এভাবেই বাংলানিউজের কাছে নিজের দুঃসহ অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন সোমা আক্তার।

জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান আজিজ ট্রেডিং করপোরেশনের মালিক বিল্লাল হোসেন বাংলানিউজকে জানান, ‘সোমাকে গৃহকর্মী হিসেবেই সৌদি আরবে পাঠানো হয়েছিল। আমাদের প্রতিষ্ঠান থেকে অনেককেই সৌদি পাঠানো হয়। কই তারা তো কোনো অভিযোগ করেছেন না। বরং কাজ করছেন। দেশে টাকা পাঠাচ্ছেন। তবে সোমা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, এমন অভিযোগ জানার পর তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।’ সোমার বাবার কাছে আড়াই লাখ টাকা দাবির অভিযোগ অস্বীকার করেন বিল্লাল।

পোড়াবাড়ি সমাজকল্যাণ সংঘের সাধারণ সম্পাদক রমজান আহামেদ বাংলানিউজকে জানান, নিজেদের কুৎসিত চেহারা প্রকাশ হয়ে যাওয়ার ভয়ে বিল্লাল হোসেন সঠিক কথা বলছেন না।

তিনি জানান, নানা প্রতিকূলতার ডিঙিয়ে একজন নারী যখন প্রবাসে কাজ করতে যান তখন তার চোখেমুখে থাকে নানা স্বপ্ন। কিন্তু সোমা সেখানে পৌঁছেই মুখোমুখি হয়েছিলো দুঃস্বপ্নের।

সবারই লক্ষ্য থাকে অভিবাসন ব্যয় তুলে ঘাত প্রতিঘাত সয়েও জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য ফেরানো। কিন্তু সোমা। অজানা এমন দুর্বিসহ পরিস্থিতির মাঝে পড়েছিলো, যেখান থেকে তাকে ফিরিয়ে না আনলে সে আত্মহত্যা করবে বলেও জানিয়েছিলো।

একটি নারী কখন কি অবস্থায় এভাবে আত্মহত্যা করতে পারে তা বিবেকবানরা বুঝলেও অনেকেরই তা বুঝতে পারেন না বা বুঝতে চান না।

এসপি হাবিবুর রহমান স্যার না থাকলে সোমা আক্তারকে হয়তো আর ফিরে পাওয়া যেতো না। কার প্রচেষ্টায় একটি নারীর জীবন রক্ষা পেলো। আমরা কার কাছে কৃতজ্ঞ।

অতিরিক্ত ডিআইজি বাংলানিউজকে বলেন, দেশে কেউ অপহৃত হলে তাকে উদ্ধার করা যতটা সহজ। সে তুলনায় প্রবাসে নির্যাতিত কাউকে উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনাটা একটু জটিল। তবে ইচ্ছে আর মানবিক প্রচেষ্টা থাকলে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়।

আমার প্রতি বেদে সম্প্রদায়ের মানুষগুলোর যে আস্থা আর ভরসা সেটাই ছিলো আমার শক্তি। তাদের মেয়েকে আমি ফিরিয়ে আনতে পেরেছি। তাদের মুখে হাসি ফোটাতে পেরেছি। এটা আমার দায়িত্ব ও কর্তব্যের অংশই। এর বেশি কিছু না।

এখন চ্যালেঞ্জ দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা বলেন পুলিশ সুপার থেকে সদ্য পদোন্নতি পাওয়া পুলিশের এই অতিরিক্ত ডিআইজি।



Related posts

মন্তব্য করুন