কিশোরী-তরুণীর ওপর সহিংসতার ধরন পাল্টেছে

কিশোরী ও তরুণীদের ওপর সহিংসতার ধরন পাল্টে গেছে। তবে অপরাধীদের নিষ্ঠুরতা আগের মতোই ভয়াবহ রয়ে গেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগে ইভটিজিং বা মেয়েদের উত্যক্ত করার ক্ষেত্রে ধরনটা ছিল প্রাথমিক অবস্থায় ভয় দেখানো, নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে খারাপ ইঙ্গিত দেওয়া। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছিল মেয়েদের চুলের আগা বা বেণির আগা কেটে নেওয়া বা ওড়না টেনে নেওয়া। সর্বশেষ ছিল এসিড নিক্ষেপ যা এখনো আছে। বর্তমানে ছুরি বা চাপাতি দিয়ে হামলার মতো ঘটনা ঘটছে।

 

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে সারা দেশে নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৩৭৪টি। এর মধ্যে ৪৯টি হত্যা, ১৩টি হত্যার চেষ্টা, ৩২টি উত্যক্তের ঘটনা, উত্যক্তের কারণে ৩টি আত্মহত্যার ঘটনা উল্লেখযোগ্য।

 

গত ২৪ আগস্ট রাজধানীর কাঁকরাইলে ছুরিকাঘাতে নিহত হয় উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের শিক্ষার্থী সুরাইয়া আক্তার রিশা। হত্যাকারী যুবক ওবায়দুলকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তিনি বলেছেন, প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় রিশাকে তিনি ছুরিকাঘাত করেছেন।

 

প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় সিলেট মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী খাদিজা বেগমকে গত ৩ অক্টোবর সিলেট মুরারী চাঁদ কলেজ ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে কুপিয়ে আহত করেন শাহাজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের  শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগ নেতা বদরুল আলম। ৪ অক্টোবর থেকে খাদিজা স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ১৯ অক্টোবর মিরপুরে বিসিআইসি কলেজের ছাত্রীকে বখাটেরা মারধর করে। একই দিন সন্ধ্যায় মুন্সীগঞ্জের সিরাজদী খান এলাকায় দশম শ্রেণির ছাত্রী তাহমিনা জাহান আঁখিকে কুপিয়ে জখম করে দুর্বৃত্তরা। ২৩ অক্টোবর রাজধানীর দক্ষিণখানে অস্ত্রের মুখে পরিবারের সামনে এক কিশোরীকে ধর্ষণ করা হয়।

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যারা নারী নির্যাতন বা কিশোরীদের উত্যক্ত করে তারা তাদের পরিবার থেকে মূল্যবোধের শিক্ষা পায়নি। এ জন্য তারা এ ধরনের ঘটনা ঘটায়। যখন একটি ঘটনা ঘটে তখন সেটি অন্য একজন মানুষের মনের ওপর অপরাধ প্রবণতার প্রভাব ফেলে। এ জন্য ওই ব্যক্তিও হিংস্র হয়ে ওঠে। যার ফলে একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে।

 

অন্যদিকে সামাজিক অপরাধ সংঘটিত হওয়ার ক্ষেত্রে গণমাধ্যম, বিশেষ করে চলচ্চিত্র ও নাটকের মানহীন গল্পকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, চলচ্চিত্রে অনেক চরিত্র থাকে যা অনেকে নকল করার চেষ্টা করে বা অনুসরণ করে। আর বর্তমানে যেসব চলচ্চিত্র বা নাটক তৈরি হয় তাতে অনেক চরিত্র থাকে যা দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ও হিংস্রতা ফুটিয়ে তোলে। আর এই বিষয়গুলো থেকে মানুষ অপরাধ করতে উৎসাহ পায়।

 

বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক সালমা আলী বলেন, ‘যখন কোনো ঘটনা ঘটে তখন সেটি বারবার ঘটতে থাকে। সেই সময় যারা অপরাধ করতে চায়, তারা শাস্তির বিষয়ে চিন্তা করে না। সে ভাবে, যেভাবেই হোক মনের ক্ষোভ মেটাতে হবে।’

 

তিনি বলেন, ‘বেশ কয়েক বছর আগে দেশে এসিড সন্ত্রাসের মাত্রা ভয়ংকর রূপ নিয়েছিল, যদিও এটি সামাজিকভাবে প্রতিহত করা অনেকখানি সম্ভব হয়েছে। তখন আমরা একটা বিষয় লক্ষ করেছি যে, একটা জায়গায় এসিড নিক্ষেপের ঘটনা ঘটার সাথে সাথে সারা দেশে এর প্রভাব পড়েছিল। কিশোরী বা তরুণীর প্রতি হিংস্র অপরাধের ক্ষেত্রে সবাই এসিড ব্যবহার করত। এসিডের ব্যবহারের ওপর যখন নিষেধাজ্ঞা আনা হয় তখন অপরাধীরা অন্য পন্থা অবলম্বন করে। এখন তারা চাপাতি ব্যবহার করছে। চাপাতি বা ছোরা সহজে পাওয়া যায়, দামও কম, বহনেও ঝামেলা নেই। তাই তারা অপরাধ করতে চাপাতি বেশি ব্যবহার করছে। চাপাতির ওপরও নিষেধাজ্ঞা আনা প্রয়োজন।’

 

সামাজিক অপরাধ বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে গণমাধ্যমকে দায়ী করছেন অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক সৈয়দ মাহফুজুল হক মারজান। তিনি বলেছেন, ‘সম্প্রতি যে কয়েকটি হামলা হয়েছে তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এসব টার্গেট ওরিয়েন্টেড। আর যারা ঘটাচ্ছে তারা পেশাদার না। তাহলে নিশ্চয়ই তারা এই বিষয়টি কোথাও না কোথাও থেকে শিখেছে। তারা ভাবছে, কম টাকার একটা চাপাতি কিনে দুই থেকে তিনটা কোপ দিয়ে একজন মানুষকে হত্যা করা যায়। এটাকে তারা ভালো অস্ত্র হিসেবে নিচ্ছে। এ ব্যাপারে আমার অবজারভেশন হলো- অপরাধীরা গণমাধ্যম থেকে শিখছে যে, সহজ উপায়ে কীভাবে মানুষ হত্যা করা যায়।’

 

তিনি বলেন, ‘যত দিন যাচ্ছে মানুষ তত নির্মম হচ্ছে। আগে ইভটিজিংয়ের ক্ষেত্রে দেখা যেত বখাটেরা মেয়েকে হুমকি দিচ্ছে, পথে দাঁড়িয়ে বিরক্ত করছে। এরপর দেখা গেল ছেলেরা মেয়েদের প্রেমের প্রস্তাব করলে যদি রাজি না হয় তাহলে তার চুল কেটে দিয়েছে, ওড়না ধরে টানছে ইত্যাদি। গত কয়েক বছর আগে ছিল এসিড নিক্ষেপ করে পালিয়ে যাওয়া। এখন তো প্রকাশ্যে ছুরি বা চাপাতি দিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে আঘাত করা হয়।’

 

তিনি বলেন, ‘দেশে টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনা বেশি মাত্রায় দেখা যাচ্ছে ২০১৩ সাল থেকে। এর প্রায় প্রতিটিতে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে চাপাতি। এসব বিষয় নিয়ে টিভিতে টক-শো হচ্ছে, রক্ত পড়ে আছে বা চাপাতির দৃশ্য দেখানো হচ্ছে। যা দেখার পর যারা অপরাধ করতে চায় তাদের অবচেতন মনে একটা প্রভাব পড়ছে এবং এখন তারা বাস্তবে তা প্রয়োগ করছে।’

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নেহাল করিম বলেন, ‘সময়ের পরিক্রমায় ইভটিজিং ও মেয়েদের প্রতি সহিংসতার ধরন বদলেছে। অপরাধীদের মনোভাবও চরম বিকৃত হয়ে উঠেছে।’

 

তিনি বলেন, ‘যার যার বেড়ে ওঠার ওপর তার আচার আচরণ, তার মনের সংকীর্ণতা, উদারতা প্রতিফলিত হয়। যারা মেয়েদের ওপর এসিড নিক্ষেপ করে, হত্যার উদ্দেশ্যে যারা চপাতি দিয়ে কুপিয়ে আহত করে তাদের বেড়ে ওঠা সুন্দর হয়নি। তাদের মধ্যে কোনো মূল্যবোধ বা পারিবারিক শিক্ষা নেই। এমনকি জাগতিক শিক্ষাও নেই। তাদের ভেতরে কখনো মানবিক মূল্যবোধ জাগেনি এবং তারা ভালো পরিবেশে বড় হয়নি। কারণ, একজন মানুষের হিতাহিত জ্ঞান থাকলে সে মানুষকে কোপানোর মতো কাজ করত না।’

 

সম্প্রতি যেসব সামাজিক অপরাধ ঘটছে তা বন্ধ করতে গণমাধ্যম ও সরকারকে ভূমিকা রাখতে হবে বলে মনে করেন সৈয়দ মাহফুজুল হক ও সালমা আলী। অন্যদিকে নেহাল করিম মনে করেন, বিচারের প্রতি যদি মানুষের শ্রদ্ধা বাড়ানো যায় তাহলে অপরাধের মাত্রা অনেকাংশেই কমে আসবে।

 

মাহফুজুল হক বলেন, ‘সমাজে মানুষের ওপর প্রভাব ফেলবে বা অপরাধ প্রবণতা বাড়াবে- এমন কন্টেন্ট গণমাধ্যমে পরিহার করতে হবে। বিশেষ করে নাটক-সিনেমা তৈরির ক্ষেত্রে অস্ত্রের ব্যবহারে সেন্সর আরোপ করতে পারলে সমাজে অপরাধ প্রবণতা কমে আসবে।’

 

সালমা আলী বলেন, ‘২০ বছর আগের সিনেমা বা নাটকগুলোতে নায়কের চরিত্র থাকত এমন যে, নায়ক নিয়মিত কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যায়, পড়ালেখায় মনযোগী, সমাজ ও দেশের পরিবর্তন সৃষ্টিকারী ব্যক্তি। বর্তমানে সিনেমা-নাটকে নায়কের কাজ থাকে মেয়েদের ওড়না ধরে টান দেওয়া, মেয়েকে কিডন্যাপ করা, রাস্তায় দাঁড়িয়ে উত্যক্ত করা। বিনোদনের জন্য যারা এই নাটক বা সিনেমা দেখে তারা কী শিখবে?’

 

নেহাল করিম বলেন, ‘আমাদের দেশে প্রতিটি অপরাধের বিপরীতে আইন আছে কিন্তু তার সঠিক প্রয়োগ নেই। এ জন্য আমরা কেউ আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না। ফলে অনৈতিক ও অসামাজিক কাজগুলো ঘটছে। অন্যদিকে অনেকে মনে করেন অপরাধ করেও রাজনৈতিক খুঁটির জোরে পার পেয়ে যাবে।’

 

 



Related posts

মন্তব্য করুন