মানিকগঞ্জের বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তাদের অফিস ফাঁকি যেন রুটিন এ পরিণত

14915227_989734367804220_5517693679436323462_n

বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা। মানিকগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস। সহকারী পরিচালক (এডি) শরিফুল ইসলাম দপ্তরে নেই। একজন কর্মকর্তা জানান, তিনি অফিসের কাজে সিঙ্গাইর আছেন।

বুধবার বেলা তিনটা। এলজিইডি অফিস। প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল বারেক হাওলাদার দুপরের খাবার খেতে গিয়ে তখনো ফেরেননি।

মানিকগঞ্জের বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অফিস ফাঁকি দিচ্ছেন বলে অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে। কয়েক দিনের অনুসন্ধানে দেখা যায়, অনেক কর্মকর্তা সকালে সঠিক সময়ে অফিসে যান না, কেউবা দুপুরে বাসায় খেতে গিয়ে সেদিন আর অফিসে ফেরেন না। ঢাকায় বসবাস করা অনেক সরকারি কর্মকর্তা বুধবার অফিস করে বাড়ি চলে যান। পরবর্তী রোববার দুপুরের দিকে অফিসে উপস্থিত হন এসব অফিস-প্রধান।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, জেলার বাইরে অবস্থান করা একজন সরকারি কর্মকর্তা সপ্তাহে তিন দিনের বেশি অফিস করেন না। অফিস-প্রধানদের অনিয়মের সুযোগ নিচ্ছেন তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা।

বৃহস্পতিবার দুপুরে আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক (এডি) শরিফুল ইসলাম অফিসের কাজে সিঙ্গাইর গেছেন বলে জানিয়েছিলেন এক কর্মকর্তা। বেলা তিনটার দিকে তিনি অফিসে এলে তার সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে এ প্রতিবেদককে তিনি জানান, ঘিওর উপজেলায় তার এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন তিনি।

এদিকে পাসপোর্ট অফিসের প্রধান কর্মকর্তার অনুপস্থিতিতে সব যেন এলোমেলো। পাসপোর্ট ফরম জমা দেয়ার জন্য কাউন্টারের সামনে দীর্ঘ সারি। দৌলতপুর উপজেলার বাঘুটিয়া এলাকা থেকে পাসপোর্ট ফরম জমা দিতে আসা সাইদুজ্জামান টিপু বলেন, দুই ঘণ্টা ধরে কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। কিন্তু আবেদন সঠিক আছে কি না তা যাচাই করাতে পারেননি।

সিঙ্গাইর উপজেলার চান্দইর এলাকা থেকে আসা দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমি সকাল নয়টার সময় অফিসে এসেছি। এক জায়গায় আড়াই ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছি। এখানকার কর্মকর্তা একবার আসেন, আবার ওপরে যান। এই অবস্থায় আমি এখন পর্যন্ত ফরম চেক (সঠিক আছে কি না) করতে দিতে পারিনি।’

দেলোয়ারের মতো সদর উপজেলার বকজুরি এলাকার রওশন আলী, সিঙ্গাইর উপজেলার ধল্লা এলাকার সাইদখান ও ঘিওর সদর উপজেলার আম্বিয়াসহ আরো অনেকে দীর্ঘ সারিতে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু পাসপোর্ট করার আবেদন ফরম কর্মকর্তাদের দেখাতে পারেননি।

অফিসের দ্বিতীয় তলায় গিয়ে দেখা যায় কাউন্টারের কর্মকর্তা সুমন তালুকদার এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলছেন। এ সময় তিনি এ প্রতিবেদককে দেখে দ্রুত নিচে নেমে ফরম জমা নিতে শুরু করেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘আমি হিসাব শাখায় আছি। কাউন্টারের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা বদলি হয়ে যাওয়ায় আমাকে ফরম জমা নিতে হচ্ছে।’

গত বুধবার বেলা তিনটার দিকে এলজিইডি অফিসে গিয়ে দেখা যায় প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল বারেক হাওলাদার অফিসে নেই। তার খোঁজ জানতে চাইলে অফিসের এক কর্মকর্তা বলেন, তিনি দুপুরের খাবার খেতে গেছেন।

সড়ক ও জনপদ বিভাগের অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী মহিবুল হককেও নিয়মিত অফিসে পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ আছে। তিনি বেশির ভাগ সময় ব্যক্তিগত কাজে বাইরে থাকেন।

এই চিত্র মানিকগঞ্জের সব সরকারি সেক্টরের। জেলা পর্যায়ের সরকারি অফিস তো আছেই, উপজেলার সরকারি অফিসে এর চিত্র আরো ভয়াবহ।

অনুসন্ধানে গিয়ে জানা গেছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল, সরকারি হাসপাতাল, কৃষি অফিস, মৎস্য অফিস, বন বিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিআরটিএ, ভূমি অফিসের প্রধান কর্মকর্তাসহ সহকারী কর্মকর্তাদের নিয়মিত অফিসে পাওয়া যায় না। এ জন্য দুর্ভোগ পোহাতে হয় সরকারি সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষকে। এ ছাড়া অনেক সরকারি কর্মকর্তার পরিবার থাকে ঢাকায়। তারা বুধবার চলে যান, রোববারের আগে আর অফিসে আসেন না।

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক রাশিদা ফেরদৌস  বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের অফিসসূচি সকাল নয়টা থেকে বিকেল পাঁচটা। মাঝখানে এক ঘণ্টার খাবার বিরতি। এর বাইরে কোনো কর্মকর্তা সরকারি কাজে বাইরে গেলে তা অফিসকে জানিয়ে যেতে হয়। যদি কোনো কর্মকর্তা এই সরকারি আদেশের ব্যত্যয় ঘটান তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।’

জেলা প্রশাসক বলেন, জেলা পর্যায়ের আগামী মাসিক সমন্বয় সভায় অফিসের সূচি অনুয়ায়ী উপস্থিত থাকার বিষয়ে কর্মকর্তাদের সতর্ক করে দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

13211060_1285821511446546_688551162_o-png



Related posts

মন্তব্য করুন