শুভ শুভ শুভ দিন বঙ্গবন্ধুর শুভ জন্ম দিন

ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আজ জন্মদিন। ১৯২০ সালের এই দিনে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি ও ভারতীয় উপমহাদেশের একজন অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যিনি বাঙালির অধিকার রায় ব্রিটিশ ভারত থেকে ভারত-বিভাজন আন্দোলন এবং পরবর্তী সময়ে পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নেতৃত্ব প্রদান করেন। বাঙালি সভ্যতার আধুনিক স্থপতি হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের জাতির জনক। তিনি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী লীগের সভাপতি, বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি এবং পরবর্তী সময়ে এ দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। জনসাধারণের কাছে তিনি শেখ মুজিব ও শেখ সাহেব হিসেবে বেশি পরিচিত এবং তার উপাধি বঙ্গবন্ধু। ১৯৪৭-এ ভারত বিভাগ-পরবর্তী পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতির প্রাথমিক পর্যায়ে শেখ মুজিব ছিলেন তরুণ ছাত্রনেতা। পরবর্তী সময়ে তিনি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী লীগের সভাপতি হন। সমাজতন্ত্রের প সমর্থনকারী একজন অধিবক্তা হিসেবে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগোষ্ঠীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলেন।

শুভ শুভ শুভ দিন বঙ্গবন্ধুর শুভ জন্ম দিন

শেখ মুজিবুর রহমান তদানীন্তন ভারতীয় উপমহাদেশের বঙ্গপ্রদেশের অন্তর্ভুক্ত ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার পাটগাতী ইউনিয়নের টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা শেখ লুৎফর রহমান গোপালগঞ্জ দায়রা আদালতের সেরেস্তাদার ছিলেন এবং মায়ের নাম সায়রা খাতুন। চার কন্যা ও দুই পুত্রের সংসারে তিনি ছিলেন তৃতীয় সন্তান। তার বড় বোন ফাতেমা বেগম, মেজ বোন আছিয়া বেগম, সেজ বোন হেলেন ও ছোট বোন লাইলী। তার ছোট ভাইয়ের নাম শেখ আবু নাসের। ১৯২৭ সালে শেখ মুজিব গিমাডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করেন যখন তার বয়স সাত বছর। ৯ বছর বয়সে তথা ১৯২৯ সালে গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুলে ভর্তি হন এবং সেখানেই ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। ১৯৩৭ সালে গোপালগঞ্জে মাথুরানাথ ইনস্টিটিউট মিশন স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯৩৪ থেকে চার বছর তিনি বিদ্যালয়ের পাঠ চালিয়ে যেতে পারেননি। কারণ তার চোখে জটিল রোগের কারণে সার্জারি করাতে হয়েছিল। এবং এ থেকে সম্পূর্ণ সেরে ওঠতে বেশ সময় লেগেছিল। গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুল থেকে তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। ১৯৩৮ সালে ১৮ বছর বয়সে তার সঙ্গে ফজিলাতুন্নেছার বিয়ে হয়। এই দম্পতির ঘরে দুই কন্যা ও তিন পুত্রের জন্ম হয়। কন্যা হলেনÑ শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। আর পুত্র হলেন শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শেখ রাসেল। মুজিবের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল ১৯৩৯ সালে মিশনারি স্কুলে পড়ার সময় থেকেই। এ বছর স্কুল পরিদর্শনে এসেছিলেন তদানীন্তন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা একে ফজলুল হক এবং পরবর্তীতে বাংলার প্রধানমন্ত্রী এবং এমনকি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকারী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। তিনি স্কুলের ছাদ সংস্কারের দাবির ওপর ভিত্তি করে একটি দল নিয়ে তাদের কাছে যান, যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু নিজেই। ১৯৪০ সালে নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে যোগ দেন। সেখানে তিনি এক বছর মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৪২ সালে এন্ট্রান্স পাস করার পর কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে (বর্তমান নাম মাওলানা আজাদ কলেজ) আইন পড়ার জন্য ভর্তি হন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত এই কলেজটি তখন বেশ নামকরা ছিল। এই কলেজ থেকে সক্রিয়ভাবে ছাত্ররাজনীতি শুরু করেন।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ প্রাদেশিক আইনসভায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। পূর্ব পাকিস্তানের কোটার দুটি আসন ছাড়া বাকি সব আসনে জয়ী হওয়ার জন্য জাতীয় সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতাও অর্জন করে আওয়ামী লীগ। নির্বাচনের ফলাফল পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে মেরুকরণ সৃষ্টি করে। পশ্চিম পাকিস্তানের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের নেতা জুলফিকার আলি ভুট্টো মুজিবের স্বায়ত্তশাসনের নীতির প্রবল বিরোধিতা করেন। ভুট্টো অ্যাসেম্বলি বয়কট করার হুমকি দিয়ে ঘোষণা দেনÑ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান মুজিবকে সরকার গঠনের জন্য আহ্বান জানালে তিনি সে সরকারকে মেনে নেবেন না। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে ইয়াহিয়া খান সংসদ ডাকতে দেরি করছিলেন। বাঙালিরা এতে বুঝে ফেলেন যে, মুজিবের দলকে সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও সরকার গঠন করতে দেওয়া হবে না। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে এক জনসভায় শেখ মুজিব স্বাধীনতার ডাক দেন এবং জনগণকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত করেন। ইয়াহিয়া খান সামরিক আইন জারি করে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন এবং মুজিবসহ আওয়ামী লীগের অন্য নেতাদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী রাজনৈতিক ও জনসাধারণের অসন্তোষ দমনে ২৫ মার্চ অপারেশন সার্চলাইট শুরু করে। সামরিক বাহিনীর অভিযান শুরু হলে মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ধানম-ির ৩২নং বাড়ি থেকে অয়্যারলেসের মাধ্যমে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। মূল ঘোষণার অনুবাদ নিম্নরূপÑ ‘এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের মানুষকে আহ্বান জানাইÑ আপনারা যেখানেই থাকুন, আপনাদের সর্বস্ব দিয়ে দখলদার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধ চালিয়ে যান। বাংলাদেশের মাটি থেকে সর্বশেষ পাকিস্তানি সৈন্যটিকে উৎখাত করা এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের আগ পর্যন্ত আপনাদের যুদ্ধ অব্যাহত থাকুক।’ মুজিবকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। এবং ফয়সালাবাদের একটি জেলে কড়া নিরাপত্তায় রাখা হয়। পাকিস্তানি জেনারেল রহিমুদ্দিন খান মুজিবের মামলা পরিচালনা করেন। মামলার আসল কার্যপ্রণালি এবং রায় কখনই জনসমে প্রকাশ করা হয়নি। এ মামলাটি লায়ালপুর ট্রায়াল হিসেবে অভিহিত। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পরিচালিত অভিযান অল্পসময়ের মধ্যেই হিংস্রতা ও তীব্র রক্তপাতে রূপ নেয়। রাজাকারদের সহায়তায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাঙালি বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ ও ইউনিয়ন নেতৃবৃন্দসহ সাধারণ মানুষকে আক্রমণ করে। বাঙালি ও অবাঙালি হিন্দুদের ল্য করে বিশেষ অভিযানের কারণে বছরজুড়ে প্রচুর হিন্দু জনগোষ্ঠী সীমান্ত অতিক্রম করে পার্শ্ববর্তী পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরায় আশ্রয় গ্রহণ করে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে ও পুলিশ রেজিমেন্টে কর্মরত পূর্ববাংলার সদস্যবৃন্দ দ্রুত বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং লীগ সদস্যবৃন্দ কলকাতায় তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে প্রবাসে বাংলাদেশ সরকার গঠন করে। পূর্ব পাকিস্তানে মুক্তিবাহিনীর নেতৃত্ব বড় রকমের বিদ্রোহ সংঘটিত হতে থাকে। আন্তর্জাতিক চাপ থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তান সরকার মুজিবকে ছেড়ে দিতে এবং তার সঙ্গে সমঝোতা করতে অস্বীকৃতি জানায়। যুদ্ধবর্তী সময়ে মুজিবের পরিবারকে গৃহবন্দি করে রাখা হয়। তার সন্তান শেখ কামাল মুক্তিবাহিনীর একজন গুরুত্বপূর্ণ অফিসার ছিলেন। মুক্তিবাহিনী ও পাকিস্তান বাহিনীর ভেতরে সংঘটিত যুদ্ধটিই বাংলাদেশের ‘স্বাধীনতাযুদ্ধ’ নামে পরিচিত। ১৯৭১ সালে ভারতীয় সরকারের অংশগ্রহণের পর, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর যৌথ দলের কাছে আত্মসমর্পণ করে এবং লীগ নেতৃবৃন্দ ঢাকায় ফিরে সরকার গঠন করে। পাকিস্তানি শাসকবৃন্দ মুজিবকে ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি মুক্তি দেয়। এর পর তিনি লন্ডন হয়ে নতুন দিল্লিতে ফিরে আসেন। এবং ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাাতের পর জনসমে ভারতের জনগণ আমার জনগণের শ্রেষ্ঠ বন্ধু বলে তাকে সাধুবাদ জানান। তিনি ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বাংলাদেশে ফিরে আসেন।

গান্ধীর সঙ্গে সেদিন তিনি ঢাকায় জড়ো হওয়া প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের সামনে বক্তৃতা দেন। শেখ মুজিবুর রহমান অল্পদিনের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপতি ছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭০-এ পূর্ব পাকিস্তান আইনসভার জন্য নির্বাচিত রাজনীতিবিদরা নতুন রাষ্ট্রের প্রথম সংসদ গঠন করেন। মুক্তিবাহিনী এবং অন্য মিলিশিয়াদের নিয়ে নতুন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী গঠিত হয়। তারই অভিপ্রায়ে ১৭ মার্চ ১৯৭২ সালে ভারতীয় বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের ভূখ- ত্যাগ করে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণ করেন। টাইম ম্যাগাজিন ইউএসএ ১৭ জানুয়ারি ১৯৭২-এর ভাষায় গত মার্চে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর পর বিশ্বব্যাংকের পরিদর্শকদের একটি বিশেষ টিম কিছু শহর প্রদণি করে বলেছিলেনÑ ওগুলোকে দেখতে ভুতুড়ে নগরী মনে হয়। এর পর থেকে যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত ধ্বংসলীলার শেষ নেই। ৬০ লাখ ঘরবাড়ি মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং ২৪ লাখ কৃষক পরিবারের কাছে জমি চাষের মতো গরু বা উপকরণও নেই। পরিবহনব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। রাস্তাঘাট তিগ্রস্ত হয়েছে। পুল-কালভার্টের চিহ্নও নেই এবং অভ্যন্তরীণ নৌ যোগাযোগেও অনেক বাধাবিঘœ। এক মাস আগে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণ পর্যন্ত দেশের ওপর নির্বিচার বলাৎকার চলেছে। যুদ্ধের শেষদিকে পাকিস্তানি মালিকানাধীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো মূলত প্রতিটি ব্যবসা ত্রেই পাকিস্তানিদের দখলে ছিল। তাদের সব অর্থসম্পদ পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার করে দেয়। যুদ্ধ শেষে চট্টগ্রামে পাকিস্তান বিমানের অ্যাকাউন্টে মাত্র ১১৭ রুপি জমা পাওয়া গিয়েছিল। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ব্যাংক নোট ও কয়েনগুলো ধ্বংস করে দেয়। ফলে সাধারণ মানুষ নগদ টাকার প্রকট সংকটে পড়ে। রাস্তা থেকে প্রাইভেটকারগুলো তুলে নেওয়া হয়, গাড়ির ডিলারদের কাছে থাকা গাড়িগুলো নিয়ে নেওয়া হয় এবং এগুলো নৌবন্দর বন্ধ হওয়ার আগ মুহূর্তে পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার করে দেওয়া হয়। বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে স্বীকৃতি লাভের পর শেখ মুজিব পাকিস্তান, ওআইসি, জাতিসংঘ ও জোট নিরপে আন্দোলনে বাংলাদেশের সদস্যপদ নিশ্চিত করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অন্যান্য ইউরোপীয় দেশে ভ্রমণ করে বাংলাদেশের জন্য মানবীয় ও উন্নয়নকল্পের জন্য সহযোগিতা চান। তিনি ভারতের সঙ্গে একটি ২৫ বছরমেয়াদি মিত্রতা চুক্তি স্বার করেন, যাতে অর্থনৈতিক ও মানবসম্পদ উন্নয়নে ব্যাপক সাহায্যের আশ্বাস দেওয়া হয়। চুক্তিতে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনী ও সরকারি র্কমকর্তাদের প্রশিণের শর্ত অন্তর্ভুত ছিল। মুজিব ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখেন। মুজিবের জীবদ্দশায় দুই সরকারের মধ্যে পারস্পরিক সমঝোতা ছিল। মুজিব তার অন্তর্র্বর্তী সংসদকে একটি নতুন সংবিধান রচনার দায়িত্ব দেন এবং চারটি মূলনীতি হিসেবে জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র ঘোষণা করেন, যা মুজিববাদ নামেও পরিচিত। মুজিব শতাধিক শিল্প প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানি রাষ্ট্রীয়করণ করেন এবং ভূমি ও মূলধন বাজেয়াপ্ত করে ভূমি পুনর্বণ্টনের মাধ্যমে কৃষকদের সাহায্যের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধকালে ভারতে আশ্রয়গ্রহণকারী এক কোটি শরণার্থীর পুনর্বাসনের জন্য বড় পদপে নেওয়া হয়। ফলে অর্থনৈতিক সংকট হ্রাস পেতে শুরু করে এবং সমূহ দুর্ভি এড়ানো সম্ভব হয়। ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে নতুন সংবিধান কার্যকর করা হয়। এবং ১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে শেখ মুজিব ও তার দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং তিনি বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত সরকার গঠন করেন। তিনি প্রাথমিক শিা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, খাদ্য, স্বাস্থ্য, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিতকল্পে রাষ্ট্রীয় কর্মকা-ের বিস্তৃতি ঘটান। ১৯৭৩ সালে প্রণীত বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় কৃষি, গ্রামীণ অবকাঠামো ও কুটিরশিল্প উন্নয়নে অগ্রাধিকারমূলক সরকারি অর্থ বরাদ্দের নির্দেশ দেওয়া হয়। ধর্মনিরপেতার প্রতি রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও মুজিব ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় কর্মকা-ের মাধ্যমে ইসলামি অনুশাসনের পথে অগ্রসর হন। তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে আঁতাতের অভিযোগে ১৯৭২ সালে নিষিদ্ধ ঘোষিত ইসলামিক একাডেমি পুনরায় চালু করেন। ইসলামিক গোত্রগুলোর জোর দাবির পরিপ্রেেিত মদ তৈরি ও বিপণন এবং জুয়া খেলা নিষিদ্ধ করেন। তারই সিদ্ধান্তক্রমে বাংলাদেশ অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কনফারেন্স ও ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সদস্যপদ গ্রহণ করে। মুজিব ১৯৭৪ সালে লাহোরে অনুষ্ঠিত ওআইসি সম্মেলনে যোগ দিতে যান, যা পাকিস্তানের সঙ্গে কিছুমাত্রায় সম্পর্কোন্নয়ন ও পাকিস্তানের স্বীকৃতি পেতে সহায়তা করে। জনসাধারণের সামনে উপস্থিতি ও ভাষণের সময় শেখ মুজিব ইসলামিক সম্ভাষণ ও সেøাগান ব্যবহার বাড়িয়ে দেন। এবং ইসলামিক আদর্শের উল্লেখ করতে থাকেন। স্বাধীনতার পর মুজিবের সরকারকে ক্রমশ বাড়তে থাকা অসন্তোষ সামাল দিতে হয়। ১৯৭৪ সালের দুর্ভি খাদ্য সংকট আরও বাড়িয়ে দেয় এবং অর্থনীতির প্রধান উৎস কৃষিকে ধ্বংস করে ফেলে। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সংঘাতের মাত্রা বাড়তে থাকায় মুজিবও তার মতা বাড়াতে থাকেন। এর পর ১৯৭৫ সালের ইতিহাস সবারই জানা। আজকে জনকের জন্মদিনে সেই ভয়াল অতীতের বেদনাবিধুর স্মৃতি আর উসকে দিতে চাই না। ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করতে পারলেও মানুষের মন থেকে তার অস্তিত্ব মুছে দিতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুর মতো নেতা আর তার আদর্শকে যে হত্যা করা যায় না তা আজকের বাংলাদেশে প্রমাণিত। বঙ্গবন্ধু বারবার জন্মগ্রহণ করছেন নতুন নামে নতুন অভিধায় এই সোনার বাংলায়। তাই তো এখনো আওয়ামী লীগের আদর্শগত প্রতীক হয়ে আছেন এবং দলটি মুজিবের সমাজতান্ত্রিক ভাবধারা ধারণ করে চলেছে। মুজিব বাংলাদেশ, ভারত ও বিশ্বের বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের কাছে ব্যাপকভাবে সমাদৃত। পাকিস্তানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন এবং পাকিস্তানের গোষ্ঠীগত বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও বাঙালিদের আন্দোলনকে স্বাধীনতার পথে ধাবিত করার জন্য তিনি ব্যাপকভাবে প্রশংসিত। ২০০৪ সালে বিবিসির বাংলা রেডিও সার্ভিসের প থেকে সারা বিশ্বে যে জরিপ চালানো হয়, তাতে মুজিব সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে বিবেচিত হন। সন্দেহাতীতভাবেই মুজিবের উদ্দেশ্য ছিল তার দেশ ও দেশের মানুষের উন্নয়ন ঘটানো। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মুজিব একটা সোনার বাংলা গড়তে চেয়েছিলেন, যে সোনার বাংলার উপমা তিনি পেয়েছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছ থেকে। ভালবেসে মুজিব সেই সোনার বাংলার স্বপ্নকে তার দেশের জাতীয় সংগীত নির্বাচন করেছিলেন। বাঙালির ঘরে জন্ম নেওয়া প্রতিটি মানুষেরই ঋণ আছে জাতির জনকের কাছে। কীভাবে এই ঋণ আমরা শোধ করতে পারি? বঙ্গবন্ধুকে জানা আর তার সম্পর্কে পঠন-পাঠন, তার রাজনৈতিক ও সামাজিক দর্শনকে রাষ্ট্রীয় জীবনে বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমাদের ঋণ শোধ করতে পারি। জাতির জনকের জন্মদিনে তার প্রতি পরম শ্রদ্ধায় তাই আমার এই সামান্য লেখা নিবেদন করছি।



Related posts

মন্তব্য করুন