সর্বশেষ সংবাদ

ঐতিহ্যবাহী দোহারের জয়পাড়ার লুঙ্গি

দোহার ও নবাবগঞ্জ উপজেলার তাঁতীদের বোনা লুঙ্গির সুনাম দেশজুড়ে। প্রায় সাড়ে তিনশ’ বছর আগে তাঁতে বোনা গামছা ও শাড়ি তৈরির গোড়াপত্তন দোহারে হলেও লুঙ্গির গোড়াপত্তন হয়েছে প্রায় তিন যুগ ধরে। সেই থেকে নানা প্রতিকূলতাকে পেছনে ফেলে পূর্ব পুরুষের ঐতিহ্যকে ধরে রেখে লুঙ্গি তৈরি করে চলেছেন স্থানীয় তাঁতীরা। কালের বিবর্তনে ও আধুনিকতার ছোঁয়ায় যখন সব কিছু বদলে যাচ্ছে, ঠিক তখনও  গ্রাম বাংলা অথবা শহুরের বালক থেকে শুরু করে বয়:জ্যেষ্ঠ পর্যন্ত সবার রাত্রি যাপনের অন্যতম পোশাক এই লুঙ্গি।

ঐতিহ্যবাহী দোহারের জয়পাড়ার লুঙ্গি

দোহারের তাঁতীদের লুঙ্গির হাট বসে সপ্তাহে দুই দিন সোম ও বৃহস্পতিবার। সারাদেশে লুঙ্গির যে কয়টি হাট রয়েছে তার মধ্যে দোহারের জয়পাড়া লুঙ্গির হাট দেশজুড়ে প্রসিদ্ধ। শুধু তাই-ই নয়। দেশের নামি দামি যে কয়টি লুঙ্গির ব্রান্ড রয়েছে মানুষের মুখে মুখে তার প্রায় সব কয়টি ব্রান্ডের সুনামের দাবিদার এই জয়পাড়ার উৎপাদিত লুঙ্গি। কারণ, জয়পাড়ার উৎপাদিত লুঙ্গিই কেবল মাত্র দেশের নামী দামী ব্রান্ডের লুঙ্গির সুনামের অনেকটা উৎস। যেমন জয়পাড়া লুঙ্গি, আমানত শাহ লুঙ্গি, ফজর আলী লুঙ্গি ও অনুসন্ধান লুঙ্গীর কদর দেশের সব জায়গাতেই প্রসিদ্ধ। শুধু তাই-ই নয়, এই চার ব্রান্ডের লুঙ্গীর সুনাম দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও আছে।

লোকমুখে জানা যায়, আমানত শাহ লুঙ্গি, ফজর আলী লুঙ্গি ও  অনুসন্ধান লুঙ্গির উৎপাদন প্রথমে এই জয়পাড়া থেকেই হত। যদিও বর্তমানে আমানত শাহ ও অনুসন্ধান লুঙ্গির উৎপাদন বাবুর হাটের নরসিংদি থেকে হয়। এছাড়া ফজর আলী লুঙ্গির উৎপাদন নারায়ণগঞ্জ থেকে হয় বলে জানা যায়। তবে জয়পাড়ার লুঙ্গির গুণগত মান আর দশটি ব্রান্ডের লুঙ্গির চেয়ে আলাদা। আর সেই দাবি গর্বের সাথে করেন অত্র এলাকার লুঙ্গির কারিগর ও ব্যবসায়ীরা। জয়পাড়ার তৈরি লুঙ্গি বছরের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন আচার-রীতিতে স্বদেশ থেকে প্রবাসে যায় হাতে হাতে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাইকাররা লুঙ্গি ক্রয় করার জন্য ছুঁটে আসেন এই হাটে।

লুঙ্গির হাটকে কেন্দ্র করে রীতিমত উৎসবে পরিণত হয় জয়পাড়া বাজার লুঙ্গির হাট। জয়পাড়া হাটে তাঁতে বোনানো লুঙ্গির কদর থাকায় দেশের বিভিন্ন পাইকারদের ভিড় চোখে পরার মত। সপ্তাহে দু’দিন ক্রেতা বিক্রেতাদের মিলন মেলা বসে জয়পাড়ার লুঙ্গির হাটে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে সন্ধা পর্যন্ত লুঙ্গির হাট থাকলেও সোমবার সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত চলে এই হাট। তাঁতে বোনানো প্রতি  ৬ পিচ লুঙ্গি বিক্রি হচ্ছে ২৪শ’ থেকে ২৫শ’ টাকার মধ্যে। তবে লুঙ্গির গুনাগুণটা একটু ভালো পেতে চাইলে প্রতি বিম লুঙ্গির পাইকারি দাম পরে ৪ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত। যা পাইকাররা বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত করে প্রতিটি লুঙ্গি বিম থেকে আলাদা করে বিক্রি করবে ৯শ’ টাকা থেকে ১২শ’ টাকা পর্যন্ত। অনেক সময় দাম কমবেশী হতে পারে। তবে যে কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানে পাইকারি বাজারে লুঙ্গির দাম বেড়ে যায়।

স্থানীয় তাঁতীরা জানান, এ অঞ্চলে তাঁতে বুনানো লুঙ্গি আরামদায়ক ও টেকসই বেশি হওয়ার কারণে সারা দেশে এর কদর রয়েছে। তাই নকলের ভিড়ে দোহারের লুঙ্গির চাহিদা সব সময় একটু বেশি।

সরেজমিন জয়পাড়া লুঙ্গির হাট ঘুরে দেখা যায় উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে লুঙ্গি ক্রয় করার জন্য জয়পাড়া লুঙ্গির হাটে এসেছেন ক্রেতারা।

এ  ব্যাপারে কথা হয় জয়পাড়া বাজারে লুঙ্গি ক্রয় করতে আসা বেঙ্গল বিষ্কুট কোম্পানির দোহার-নবাবগঞ্জ, শ্রীনগর ও সিরাজদিখান এলাকার সুপারভাইজার অন্তর প্রামাণিকের  সাথে।

তিনি বলেন, জয়পাড়া লুঙ্গির সুনাম দেশজুড়ে। তবে আমার ইচ্ছে ছিল যদি দোহারে মার্কেটিং লাইনে আমার কাজ করার সুযোগ হয় তবে জয়পাড়ার লুঙ্গি জয়পাড়ায় বসে কিনব। এখন আমি জয়পাড়ায় আসলে  জয়পাড়া থেকে লুঙ্গি ক্রয় করি।

এ ব্যাপারে জয়পাড়া ব্রান্ড লুঙ্গির স্বত্ত্বাধীকারি আব্দুর রহমানের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, জয়পাড়ার উৎপাদিত লুঙ্গির কদর সারাদেশের গন্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও রফতানি হচ্ছে। যার কারণে আমার বাবার দীর্ঘ বছরের পেশাটাকে হাতেখড়ি হিসেবে নিয়ে নিজেই এক যুগ ধরে জয়পাড়া লুঙ্গির ব্রান্ড দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছি।

তিনি আরও বলেন, আমার ইচ্ছা এই ঐতিহ্যকে ধরে রেখে যতদিন বেঁচে থাকি পেশাটাকে ততদিন চালিয়ে যাব।

তবে আব্দুর রহমান অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলেন, আমার কষ্ট হয় যখন আমার জয়পাড়া ব্রান্ডের লুঙ্গিটি আমার সিল নকল করে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর হাট, এনায়েতপুর হাট, সোহাগপুর হাট ও গাউছিয়া বাবুর হাটে বিক্রি হচ্ছে।

জানা যায়, জয়পাড়া এলাকার উৎপাদিত জয়পাড়া ব্রান্ডের লুঙ্গি ঢাকার ইসলামপুর, নরসিংদির বাবুর হাট ও গাউছিয়া ভূলতা এলাকায় প্রাথমিকভাকে পাইকারি সাপ্লাই হয়। পরবর্তীতে তা অন্যান্য ব্যবসায়ীদের হাত ঘুরে দেশের বিভিন্ন মার্কেট ও হাটে চলে যায়।

অনেকটা আক্ষেপ করে জয়পাড়া বাজারের লুঙ্গি ব্যবসায়ী আহম্মদ আলী জানান, বর্তমানে লুঙ্গির বাজার অত্যধিক খারাপ। এক সময় জয়পাড়ার লুঙ্গি তৈরি করে খুবই স্বচ্ছল ছিল সবাই। বর্তমানে সুতার দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় লুঙ্গির কারিগররা লুঙ্গি তৈরিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। তবুও বাব-দাদার পেশাকে ধরে রাখতেই অনেক পরিবার এখনও লুঙ্গি তৈরি করছে। কোনো রকম ডাল ভাত খেয়ে বেঁচা থাকার জন্যই তাদের এই পেশা। কিন্তু এই মানুষগুলোর মাঝে আবার কিছু মানুষ আছে যারা ব্যবসায়িক চিন্তা ভাবনা করে পাবনার লুঙ্গিকে জয়পাড়ার লুঙ্গি বলে চালিয়ে দেন। এতে গ্রাহকরা যেমন প্রতারিত হচ্ছেন ঠিক তেমনিভাবে জয়পাড়ার লুঙ্গির ঐতিহ্য নষ্ট হচ্ছে।

তবে আশার কথা হচ্ছে শিল্পটিকে বাঁচিয়ে রাখতে পেশার সাথে জড়িত অনেক পরিবার এখনও চালিয়ে যাচ্ছেন লুঙ্গি তৈরির কাজ। তাদের প্রত্যাশা এতে করে হলেও দোহারের ঐতিহ্যবাহী লুঙ্গির কদর টিকে থাকবে। ঐতিহ্যবাহী এই জয়পাড়া লুঙ্গির হাটটি ঐতিহ্য ধরে রেখে আগামী দিনে এগিয়ে যাবে।



Related posts

মন্তব্য করুন