সর্বশেষ সংবাদ

হাশরের ময়দানে উপস্থিতদের বিভিন্ন অবস্থা : সংকলনে : সৈয়দা সুফিয়া খাতুন

জাহান্নামে অধিকাংশ মহিলা এবং সম্পদশালীরা যাবে
হযরত ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. এরশাদ করেন, আমি জান্নাতে উঁকি দিয়ে দেখলাম, তার অধিকাংশই দরিদ্র এবং আমি জাহান্নামে উঁকি দিয়ে দেখলাম, তার অধিকাংশই সম্পদশালী এবং মহিলা। [তারগীব]
এক বর্ণনায় আছে, রাসূলুল্লাহ সা. এরশাদ করেন, আমি জান্নাতে প্রবেশ করলাম, দেখলাম মর্যাদাবান জান্নাতি গরীব মুহাজির এবং মোমিনদের নাবালেগ বাচ্চারা, আর জান্নাতে সম্পদশালী এবং মহিলাদের সংখ্যা খুবই নগন্য। তখন আমাকে বলা হল, সম্পদশালীদের হিসাব হচ্ছে এবং তাদের পাপ মাফ করা হচ্ছে। আর মহিলাদের দুনিয়াতে স্বর্ণ এবং রেশম (আল্লাহর দীন থেকে) গাফেল করে রেখেছিল। সে জন্য তাদের সংখ্যা এখানে কম। [তারগীব]
সম্পদ বড় বিপদের জিনিস। তাই খেয়াল করে হালাল পন্থায় উপার্জন করা, আল্লাহ ও তাঁর বান্দাদের হক সঠিকভাবে আদায় করা এবং গুনাহের পথে খরচ না করা আবশ্যক। সম্পদ গুনাহের পথে খরচ না করাটা খুবই কঠিন। এ বিষয়ে অধিকাংশ লোকই ফেল করে। সম্পদ থাকলে মনের খাহেশ, সন্তান ও স্ত্রীর ইচ্ছা পূরণ এবং সমাজের বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানে গুনাহের কাজে খরচ করা লাগে।
অধিকাংশ লোকই তাদের সম্পদের সঠিক হিসাব করে যাকাত আদায় করে না। এমন হাজারো লোক আছে, যাদের উপর হজ্জ ফরয হয়েছে অথচ তারা হজ্জ আদায় না করেই মারা যায়। সম্পদশালীদের জন্য গুনাহের সমস্ত দরজাই খোলা থাকে। এ কারণেই সম্পদশালীরা বেশির ভাগই জাহান্নামে যাবে এবং তাদের অনেকের মধ্যে হিসাব দেয়ার জন্য জান্নাতের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। এটা তেমন কোন আশ্চর্যের বিষয় নয়।
জাহান্নামে নারীদের সংখ্যাই বেশি হবে। তাদের জাহান্নামে যাওয়ার কারণ পূর্ববর্ণিত হাদীস থেকে জানা গেছে। তারা দুনিয়াতে স্বর্ণ এবং রেশমী কাপড়ের মোহে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল হয়ে যায়। সবাই জানেন, মহিলারা মাত্রা ছাড়া অলংকার এবং কাপড়ের লোভী হয়ে থাকে। কাপড় এবং অলংকারের জন্য তারা স্বামীদের হারাম উপার্জনে এবং ঋণে রাখতে বাধ্য করে। এক অনুষ্ঠানে যে গহনা ও পোশাক পরেছে অন্য অনুষ্ঠানে তা পরা মানহানিকর ভেবে লজ্জাবোধ করে। কোথাও গরমের বাহানায় স্বল্প কাপড় পরিধান করে অন্যকে শরীর দেখায়। কতক মহিলা একত্রিত হলেই তাদের মধ্যে কার পোশাক কত আধুনিক ডিজাইনের, কোন কাপড় লেটেস্ট ডিজাইনের তা নিয়ে আলোচনা শুরু করে। এভাবে তারা নিজ নিজ পোশাক ও অলংকারের বড়াই করে, যা বড়ই গুনাহের কাজ। রাসূলুল্লাহ সা. এরশাদ করেন, যে মহিলা লোক দেখানোর জন্য স্বর্ণের অলংকার পরিধান করে সে শাস্তি ভোগ করবে। যে সমস্ত অলংকার হারাম উপার্জনের মাধ্যমে বানানো হয়েছে সেগুলোর জন্য তো আযাব ভোগ করতে হবে এটা স্পষ্ট, কিন্তু যে সমস্ত অংলকার হালাল উপার্জনের মাধ্যমে বানানো হয়, দেখা যায় সেগুলোর যাকাত স্বামী-স্ত্রী কেউই আদায় করে না। আর যে সমস্ত অলংকারের যাকাত দেয়া হবে না, কেয়ামতের দিন সেগুলো কঠিন আযাব হয়ে দাঁড়াবে।
বুখারি ও মুসলিম শরীফের এক বর্ণনায় আছে, মহিলারা রাসূলুল্লাহ সা. এর দরবারে প্রশ্ন করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ সা.! কেন মহিলারা জাহান্নামে বেশি যাবে? রাসূলুল্লাহ সা. বললেন, এজন্য যে, তোমরা বেশি লানত (অভিশাপ) দিয়ে থাক এবং স্বামীদের নাশোকরী কর (অকৃজ্ঞ হও)। [মেশকাত শরীফ]
জান্নাতবাসীদের জাহান্নাম এবং জাহান্নামবাসীদের জান্নাত দেখানো হবে
হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. এরশাদ করেন, যে জান্নাতে প্রবেশ করবে তাকে জাহান্নামের সেই স্থান অবশ্যই দেখানো হবে যা তার জন্য বরাদ্দ ছিল। যদি সে বদ আমল করত তাহলে সেখানে অবস্থান করতে হত, যাতে করে সে আল্লাহ তাআলার বেশি বেশি শোকর আদায় করে। আর যে জাহান্নামে যাবে, তাকে জান্নাতের সে স্থান অবশ্যই দেখানো হবে, যা তার জন্য বরাদ্দ ছিল। যদি সে নেক আমল করত, তাহলে সে সেখানে অবস্থান করত, যাতে করে সে আরো বিচলিত হয়। [বুখারি শরীফ]
জান্নাত এবং জাহান্নাম পূর্ণ করে দেয়া হবে
সূরা কাফে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন-  সেদিন আমি জাহান্নামকে বলব, তুমি কি পূর্ণ হয়ে গেছ? সে বলবে, আরো কিছু আছে কি? [সূরা কাফ : ৩০]
হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. এরশাদ করেন, জাহান্নামিদের জাহান্নামে ফেলা হতে থাকবে, আর জাহান্নাম বলতে থাকবে, আরো আছে কি? আরো আছে কি? এমনকি আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত জাহান্নামের উপর তাঁর (কুদরতী) পা রাখবেন, তাতে জাহান্নাম সংকীর্ণ হয়ে যাবে। তখন জাহান্নাম বলবে, আপনার ইজ্জতের কসম, যথেষ্ট হয়েছে, যথেষ্ট হয়েছে!
জান্নাতের অনেক জায়গা খালি থাকবে। তখন আল্লাহ পাক নতুন মাখলুক সৃষ্টি করে সেই খালি জায়গা পূর্ণ করে দিবেন। [বুখারি শরীফ]
অন্য এক বর্ণনায় আছে, আল্লাহ জাল্লা শানুহু জান্নাত জাহান্নাম উভয়কে পূর্ণ করে দেয়ার জিম্মাদারী নিয়েছেন। [মেশকাত শরীফ]
আল্লাহ তাআলা কারো ওপর জুলুম করেন না। তাই তিনি জাহান্নামের জন্য নতুন মাখলুক সৃষ্টি না করে স্বীয় কুদরতী পা দিয়ে তার অপূর্ণ স্থান পূর্ণ করে দিবেন। আর জান্নাতের খালি জায়গা পূর্ণ করার জন্য নতুন মাখলুক সৃষ্টি করবেন। আমাদের এক বুজুর্গের কাছে বলা হল, তারাই ভাল থাকবে যারা সৃষ্টি হয়েই জান্নাতে যাবে। তখন বুজুর্গ বললেন, তারা তেমন কি মজা উপভোগ করবে। তারা তো দুনিয়াতেই আসবে না এবং দুনিয়ার দুঃখ-কষ্টও ভোগ করবে না, তারা কিভাবে সুখ-শান্তি ও আরাম আয়েশের মজা পাবে? সুখ-শান্তি ও আরাম-আয়েশের মজা তারাই পায় যারা কষ্ট মসীবতের পর সুখ লাভ করে।
কেয়ামতের দিনের পরিমান
কেয়ামতের দিন খুবই লম্বা হবে। হাদীস শরীফে কেয়ামতের দিন পঞ্চাশ হাজার বছর পরিমাণ লম্বা হবে বলা হয়েছে। [মেশকাত শরীফ]
প্রথমবার শিংগায় ফুঁক দেয়ার পর থেকে জান্নাতিরা জান্নাতে এবং জাহান্নামিরা জাহান্নামে যাওয়া পর্যন্ত পঞ্চাশ হাজার বছর পরিমাণ সময় হবে।
এত বড় লম্বা দিন কাফের মুশরিকদের জন্য খুবই কঠিন হবে, কিন্তু ঈমানওয়ালা বান্দাদের জন্য আল্লাহ পাক খুবই সহজ করে দিবেন। হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, হুজূর সা. এর কাছে সেদিন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে, যেদিন হবে পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান। সে লম্বা দিনটি কিভাবে কাটবে? হুজূর সা. বলেন, কসম সে সত্ত্বার যাঁর হাতে আমার জান, মুমিনের জন্য সে দিনটি এত সহজ করে দেয়া হবে যেমন দুনিয়াতে ফরজ নামায আদায় করা হয়। [মেশকাত]
মোমিনদের সে দিনটি খুব সহজেই কেটে যাবে। সম্বিত না থাকার কারণে তাদের পেরেশানীও থাকবে না।
মৃত্যুর মৃত্যু
কাফের মুশরিক এবং মোনাফেকরা চিরকাল জাহান্নামে থাকবে। তাদের আর কখনও মৃত্যু হবে না এবং তাদের আযাবও হালকা করা হবে না। সূরা ফাতেরে এরশাদ হয়েছে-
‘আর যারা কাফের তাদের জন্য নির্ধারিত রয়েছে জাহান্নামের আগুন, তাদের কোন ফয়সালা হবে না, তারা মৃত্যুবরণ করবে না এবং তাদের থেকে জাহান্নামের আযাবও হালকা করা হবে না; কাফেরদের আমি এভাবেই সাজা দিয়ে থাকি।’ [সূরা ফাতির : ৩৬]
গুনাহগার মুসলমান জাহান্নামে সাজা ভোগ করার পর জান্নাতে প্রবেশ করবে। যে জান্নাতে যাবে সে সর্বদাই জান্নাতে থাকবে। জান্নাতে কারো মৃত্যু হবে না। সেখান থেকে কাউকে বেরও করা হবে না। কেউ বের হতেও চাইবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, যে জান্নাতে যাবে সে তথায় চিরদিন থাকবে। [বাইয়িনাহ : ৮] তা ছেড়ে যেতে চাইবে না। যখন সকল জান্নাতি জান্নাতে এবং সকল জাহান্নামি জাহান্নামে পৌঁছে যাবে, তখন ‘মৃত্যু’কে জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী স্থানে উপস্থিত করা হবে এবং সেখানে জবাই করা হবে। তারপর একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা দিবে, হে জান্নাতবাসী! আর মৃত্যু নেই। হে জান্নামবাসী! মৃত্যু আর নেই। এ ঘোষণা শুনে জান্নাতবাসী খুবই আনন্দিত হবে, তাদের খুশি অনেক বেড়ে যাবে। আর জাহান্নামিরা খুবই চিন্তিত হবে। তাদের পেরেশানি অনেক বেড়ে যাবে। [মেশকাত শরীফ, বোখারি শরীফ ও মুসলিম]
হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. সূরা মারইয়ামের  (ওআনযিরহুম ইয়াওমা হাশরাতি) আয়াত তেলাওয়াত করে এর তাফসীরে বলেন, মৃত্যুকে শারীরিক আকৃতি দিয়ে আনা হবে। আকৃতিতে তা হবে সাদা মেষের ন্যায়, যার দেহে কালো দাগও থাকবে। তাকে জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী দেয়ালের উপর দাঁড় করানো হবে। তারপর জান্নাতবাসীকে আহ্বান করা হবে, হে জান্নাতবাসী, এ আওয়াজ শুনে তারা ফিরে তাকাবে। এরপর জাহান্নামিদের আহ্বান করে বলা হবে, হে জাহান্নামবাসী! এ আওয়াজ শুনে তারাও ফিরে তাকাবে। এরপর (সকল জান্নাতি এবং জাহান্নামিকে) প্রশ্ন করা হবে, তোমরা কি একে চিন? তারা সবাই জবাব দিবে, হ্যাঁ (আমরা তাকে চিনি), এ তো ‘মৃত্যু’। অতঃপর তাদের সকলকে উদ্দেশ্য করে ঘোষণা দেয়া হবে, এখন আর মৃত্যু হবে না। এরপর মৃত্যুকে শুইয়ে জবাই করে দেয়া হবে। (মৃত্যুর জবাই দেখে সকল জান্নাতি খুশি আর জাহান্নামিরা খুবই পেরেশান হবে।) জান্নাতিরা এজন্য সীমাহীন আনন্দিত হবে যে, মৃত্যুর জবাইর মাধ্যমে আল্লাহর পক্ষ থেকে এ ফয়সালা হয়ে গেল, আর কখনও তাদের মৃত্যু আসবে না। তারা অনাবিল আনন্দে চিরকাল জান্নাতে বসবাস করতে থাকবে। আর জাহান্নামিরা সীমহীন পেরেশান হবে। কারণ তাদের আর মৃত্যু হবে না, চিরকালই জাহান্নামে থাকতে হবে। আল্লাহর পক্ষ থেকে যদি এ ফয়সালা না হত, জান্নাতিরা জান্নাতে এবং জাহান্নামিরা পেরেশানীতেই মরে যেত। [তিরমিযি শরীফ]



Related posts

মন্তব্য করুন