সর্বশেষ সংবাদ

পাঁচ ধাপে সোনা পাচার কমিশন কম হলেই ধরা

goldদুবাই থেকে স্বর্ণ ক্রয়ের পর পাঁচ ধাপ অতিক্রম করে চালান পৌঁছে মূল মালিক বা সিন্ডিকেটের কাছে। তবে প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপ নিয়ে কোন সমস্যা হয় না। তৃতীয় ধাপটি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এ ভাগে যারা কাজ করেন তারা পেয়ে থাকে নির্ধারিত অংকের বকশিস। আর বকশিসে কম পড়লে ধরা পড়ে স্বর্ণের চালান। চোরাচালানিরা স্বর্ণের চালানকে ‘খাতা’ এবং ‘স্কেল’ সাংকেতিক নাম দিয়েছে।  কালো কাপড়ে  সেলাই করা ১০ বা ২০ পিস ( সারিবদ্ধভাবে)  স্বর্ণ বারের চালানকে ‘স্কেল’ এবং এর বেশি ১০০ পর্যন্ত চালানকে ‘খাতা’ হিসেবে গণনা করে।- এ তথ্য জানিয়েছেন হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে ১০৬ কেজি স্বর্ণ (৯৩৬টি স্বর্ণবার)  আটকের ঘটনায় গ্রেফতারকৃত আসামিরা। গত ২৬ এপ্রিল দুবাই থেকে আসা বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটের টয়লেট থেকে উদ্ধার করা হয় এ স্বর্ণ চালান। মামলা হয় বিমানবন্দর থানায়। মামলা তদন্তের দায়িত্ব পায় মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ ঘটনার দিনই গ্রেফতার করে বিমানের ম্যাকানিক্যাল অ্যাসিসট্যান্ট আনিসুজ্জামানকে। তার দেয়া তথ্য মতে গ্রেফতার হয় সিন্ডিকেট প্রধান নজরুল ইসলামসহ ২২ জন। তাদের বেশ কয়েকজন স্বর্ণ চোরাচালান, কীভাবে দেশে স্বর্ণ প্রবেশ করে, কারা কারা জড়িত তার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন গোয়েন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদে।
স্বর্ণ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত একাধিক ব্যবসায়ি ও গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, স্বর্ণের বড় মার্কেট দুবাইতে। দেশে যে পরিমাণ স্বর্ণ আসে তার সিংহভাগই কেনা হয় দুবাই থেকে। এখান থেকে  প্রতি গ্রাম স্বর্ণ (২২ ক্যারেট) কেনা হয় ৩৭ থেকে ৩৮ ডলারের মধ্যে। যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় তিন হাজার টাকা। ১১ পয়েন্ট ৬৬ গ্রাম স্বর্ণে এক ভরি। আর এ হিসেবে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম দুবাইতে ৩৩/৩৪ হাজার টাকা। আর এই ২২ ক্যারেটের স্বর্ণ দেশে বিক্রি হয় ৪৮ থেকে ৫০ হাজার টাকার মধ্যে।
স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের মূল হোতারা স্বর্ণ কেনার পর ক্যারিয়ারের কাছে প্রদান করে। ক্যারিয়ার (যাত্রী) ফ্লাইটে ওঠার পর সীটের নীচে অথবা টয়লেটে (বিশেষ ধরনের সূতা দিয়ে বেঁধে) লুকিয়ে রাখে। বিষয়টি সিন্ডিকেটের মূল হোতারা মোবাইল ফোনে ম্যাসেজ দিয়ে ঢাকায় অবস্থানকারী সিন্ডিকেটের অপর সদস্যদের জানিয়ে দেয়। স্বর্ণের পরিমাণের ব্যাপারে স্বর্ণচোরাচালানিরা সাংকেতিক শব্দ ব্যবহার করে। ফ্লাইট হয়রত শাহজালাল বিমানবন্দরে অবতরণ করার পর স্বর্ণ ক্যারিয়ার অন্য পাঁচজন যাত্রীর মতোই নেমে যায়। সব যাত্রী নেমে যাওয়ার পর বিশেষ করে বিমান বন্দরের ইঞ্জিনিয়ারিং সেকশনের কতিপয় সদস্য এ চালান টয়লেট বা নির্ধারিত সিটের নীচ থেকে সংগ্রহ করেন। এরপর  পৌঁছে দেয়া হয় অন্য একটি গ্রুপের কাছে।  গ্রুপটি সুবিধামত সময় হ্যাংগার গেট বা কার্গো ভিলেজ গেট থেকে এ  চালান নির্ধারিত এলাকায় অপেক্ষমান কোন প্রাইভেট কারে দেয়। এরপর প্রাইভেটকার আরোহী ঐ স্বর্ণচালান পৌঁছে দেয় উত্তরা এলাকায় অবস্থানকারী নির্ধারিত ব্যক্তির কাছে। এক বা দুই দিন পর চালান পৌঁছে মূল গন্তব্যে বা আসল ব্যক্তির কাছে।
তারা আরও জানায়, স্বর্ণ চোরাচালানীরা বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটকেই বেশি নিরাপদ মনে করে। কারণ কোন বিদেশি এয়ার লাইন্সের ফ্লাইট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টার বেশি অপেক্ষা করে না। কিন্তু বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইট দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করে। অনেক সময় নেয়া হয় হ্যাংগারে। ফলে কোন ধরনের ঝুঁকি থাকে না। স্বর্ণচালান সুবিধামত সময় সরিয়ে ফেলা যায়।
তবে স্বর্ণের পরিমাণ কম হলে সাধারণত ক্যারিয়াররা শরীরের বিভিন্ন অংশে বা লাগেজে বহন করে থাকে। এ কাজে বেশি সহায়তা করে  বিমান ও কাস্টমসের কতিপয় সদস্য।
সূত্র জানায়, স্বর্ণের চালানের লেনদেন কখনোই দেশে হয় না। লেনদেন হয় দুবাইতে। তবে বিমান বন্দরে সহায়তাকারী বিমান, সিভিল এভিয়েশন, কাস্টমস, নিরাপত্তা বিভাগের সদস্যরা। তারা পেয়ে থাকে নির্ধারিত হারে কমিশন। তবে কমিশন নিয়ে ঝামেলা হলেই সাধারণ স্বর্ণ চালান আটক হয়। যে পক্ষ কমিশন থেকে বঞ্চিত হয় তারাই কোন না কোনভাবে জানিয়ে দেয় কাস্টমস ও শুল্ক গোয়েন্দাদের।
১০৬ কেজি স্বর্ণ পাচার মামলার তদন্তকর্মকর্তা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার মিনহাজ উদ্দিন জানান, এ মামলায় ২২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ চক্রের আরও কিছু সদস্যকে সনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। তাদেরকে গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
এ গোয়েন্দা কর্মকর্তা আরো জানান, পাচারকৃত স্বর্ণের একটা বড় অংশ পাচার হয় ভারতে। তবে ভারতে যারা স্বর্ণ কেনে তারাও লেনদেন করে দুবাইতে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার (উত্তর) শেখ নাজমুল আলম জানান, স্বর্ণ চোরাচালন চক্রের সিন্ডিকেট মাকড়সার জালের মত বিস্তৃত। তবে সম্প্রতি বেশ কয়েকজন বড় মাপের স্বর্ণ চোরাচালানি গ্রেফতার হওয়ায় অন্যরা সর্তক হয়ে গেছে। তবে তিনি জানান, বিমানবন্দর কেন্দি ক একটি সিন্ডিকেট অর্থের বিনিময়ে চোরাচালানের সঙ্গে জড়িতদের সহায়তা করে আসছে। এদের নাম পরিচয় পাওয়া গেছে। তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। তাদেরকে গ্রেফতার করা সম্ভব হলে জানা  যাবে আরো অনেক অজানা তথ্য।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে  ২০১৩ সালে জুন থেকে ২০১৪ সালের জুন পর্যন্ত আটক করা হয় দুই হাজার কেজি স্বর্ণবার (৫০ মণ)



Related posts

মন্তব্য করুন